প্রিয় বন্ধু সকল। আশা করছি সকলে অনেক ভালো আছেন। আজ আপনাদের সামনে হাজির হলাম পাওয়ার প্লান্ট ও গ্যাস টারবাইন সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে। এই লেখাটিতে পাওয়ার প্লান্ট এর বেসিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। আশা করছি লেখাটি পড়লে পাওয়ার প্ল্যান্ট ও গ্যাস টারবাইন সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা পাবেন। তাহলে চলুন দেখি কি কি বিষয় থাকছে এই লেখাতেঃ

  1. বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নিয়ে কিছু কথা
  2. টারবাইন কি?
  3. হাইড্রোলিক পাওয়ার প্লান্ট
  4. থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট
  5. নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট
  6. ওয়াইন্ড(বায়ু) পাওয়ার প্লান্ট
  7. সোলার পাওয়ার প্লান্ট
  8. গ্যাস টারবাইন কি?
  9. গ্যাস টারবাইনের গঠন ও কার্যপ্রণালী
  10. গ্যাস টারবাইনের সুবিধা এবং অসুবিধা

বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নিয়ে কিছু কথা

বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সংক্ষেপে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ইংরেজিতে পাওয়ার স্টেশন বলে থাকে। পাওয়ার স্টেশনে  অনেক কিছুই থাকে তবে জেনারেটর এর মধ্যে অন্যতম যাকে বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে ঘুরানো হয়ে থাকে। আমরা জানি, জেনারেটর মেকানিক্যাল এনার্জিকে ইলেকট্রিক্যাল এনার্জিতে রূপান্তরিত করে থাকে।

জেনারেটর নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন

প্রশ্ন হতে পারে এই জেনারেটরকে কিভাবে ঘুরানো হয়ে থাকে??? এই প্রশ্নের উত্তর পুরো লেখাটি পড়লে বুঝতে পারবেন 🙂

টারবাইন কি?

টারবাইন মূলত একটি মেশিন বা প্রাইম মুভার যেখানে প্রবাহীর ক্রমাগত ভরবেগের পরিবর্তন দিয়ে ঘুর্ণন গতি পাওয়া যায়।

একদম সহজ ভাষায় বলতে টারবাইন একটি ঘূর্ণমান যান্ত্রিক ডিভাইস যা তরল প্রবাহ থেকে শক্তি নিষ্কাশন করে ও দরকারী কাজে ব্যবহার করা হয়।

পাওয়ার প্ল্যান্ট
টারবাইন

টারবাইনের সাহায্যে জেনারেটরের মাধ্যমে ইলেকট্রিক পাওয়ার জেনারেট করা হয়। বিভিন্ন ধরনের টারবাইন রয়েছে যেমনঃ ষ্টীম টারবাইন, গ্যাস টারবাইন, ওয়াটার টারবাইন ইত্যাদি।

আমরা যদি আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন দেখি যেখানে ৬ ইউনিটে ষ্টীম টারবাইন এবং বাকি ২ ইউনিটে গ্যাস টারবাইন ব্যবহার করা হয়েছে।

ষ্টীম টারবাইন হলো আদর্শ প্রাইম মুভার যার ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। পাওয়ার প্ল্যান্ট জেনারেটর পরিচালনার জন্য বড় ষ্টীম টারবাইন ব্যবহার করা হয়।

হাইড্রোলিক পাওয়ার প্ল্যান্ট 

হাইড্রোলিক পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে আমাদের কাপ্তাই পাওয়ার প্ল্যান্টের কথা। পানির বিভব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে টারবাইন চালানো হয়।

পাওয়ার প্ল্যান্ট
হাইড্রোলিক পাওয়ার প্ল্যান্ট

হাইড্রোলিক শব্দের বাংলা অর্থ জলবাহী। তাহলে আমরা সাধারণ অর্থে বুঝি হাইড্রোলিক পাওয়ার প্ল্যান্ট এর মূল উৎস হলো পানি। হাইড্রোলিক পাওয়ার প্ল্যান্ট মূলত জলবিদ্যুৎ পাওয়ার প্ল্যান্ট।

আর একটু সহজ করে বলি, একটি উঁচু জায়গাতে পানিকে বাধ দিয়ে আটকানো হয়ে থাকে। ঐ উঁচু স্থানের পানি যখন নিচের দিকে পরতে দেওয়া হয় তখন তা প্রচন্ড বেগ নিয়ে পরে। এই পানি ফ্লো করেই মূলত টারবাইনের চাকাকে ঘুরানো হয়ে থাকে। টারবাইন তখন পানির বেগের সাথে ঘুরতে শুরু করে।

টারবাইনের শ্যাফটের সাথে জেনারেটরের শ্যাফট মজবুত ভাবে সংযুক্ত করা হয়। এর ফলে জেনারেটর ঘুরতে শুরু করে এবং কারেন্ট উৎপন্ন হয়।

থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট 

থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট বা তাপীয় পাওয়ার প্লান্ট এমন এক ধরনের পাওয়ার প্লান্ট যার তাপীয় শক্তিকে ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ারে কনভার্ট করা হয়।

পাওয়ার প্ল্যান্ট
থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট

থার্মাল পাওয়ার প্লান্টে পানিকে বাষ্পে পরিণত করা হয়। আর এই কাজটি করে বয়লার। অর্থাৎ থার্মাল পাওয়ার প্লান্টে বয়লয়ার থাকে যা পানিকে বাষ্পে পরিণত করে।

এই বাষ্পকে আবার উচ্চ বেগে টারবাইনের দিকে প্রবাহিত করা হয়। এই বাষ্প মূলত টারবাইনকে ঘুরায়। আর আমরা জানি টারবাইন জেনারেটরের সাথে সংযুক্ত থাকে ফলে জেনারেটর কারেন্ট উৎপন্ন করে।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট 

নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশন বা পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র একটি তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র যেখানে তাপ উৎস একটি পারমাণবিক চুল্লী। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টকে তাপীয় পাওয়ার প্ল্যান্ট ও বলা হয়ে থাকে।

পাওয়ার প্ল্যান্ট
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টে বয়লারের জায়গায় পারমানবিক চুল্লী থাকে। এই পারমানবিক চুল্লী তে পারমাণবিক ফিশন রিএকশন হয় অর্থাৎ অনেক নিউক্লিয়াস অনায়াসে বিভক্ত হয়ে যায় বা একটি অংশের উপর অন্য অংশ প্রভাব ফেলে এনার্জি রিলিজ করে।

ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় এবং এই তাপকে কাজে লাগিয়ে পানিকে বাষ্পে পরিণত করা হয়। ঐ বাষ্প মূলত টারবাইনকে ঘুরাতে সাহায্য করে ফলে জেনারেটর ও ঘুরতে শুরু করে ও বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

ওয়াইন্ড(বায়ু) পাওয়ার প্ল্যান্ট

ওয়াইন্ড শব্দের বাংলা অর্থ বায়ু। অর্থাৎ বায়ু শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়ে থাকে। ওয়াইন্ড পাওয়ার মূলত বাতাসের প্রবাহের উপর নির্ভর করে থাকে।

পাওয়ার প্ল্যান্ট
ওয়াইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট

বাতাসের প্রবাহের ফলে ওয়াইন্ড টারবাইন ঘুরতে শুরু করে। জেনারেটরের সাথে টারবাইন সংযুক্ত করা থাকে।জেনারেটর এই ঘুরন্ত মেকানিক্যাল পাওয়ারকে ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ারে রূপান্তরিত করে থাকে।

সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট

সোলার পাওয়ার বাংলা অর্থ সৌর শক্তি। সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট হলো এমন একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট যা সূর্যালোক(sunlight) শক্তিকে ইলেকট্রিক্যাল শক্তিতে রূপান্তরিত করে। এই ইলেকট্রিক শক্তি রূপান্তরিত করা হয় ডাইরেক্টলি  ফোটোভোলটাইক ব্যবহার করে আর ইনডাইরেক্টলি কেন্দ্রীভূত সোলার শক্তি মাধ্যমে।

পাওয়ার প্ল্যান্ট
সোলার প্যানেল

কেন্দ্রীভূত সোলার শক্তিতে লেন্স অথবা আয়না (mirror) এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয় যাতে করে অনেক বড় এরিয়া ফোকাস করতে পারে (সূর্যের আলোকে নির্দিষ্ট আলোকরশ্মি দিকে)।

ফোটোভোলটাইক সেল মূলত আলোক শক্তিকে ইলেকট্রিক শক্তিকে রূপান্তরিত করে।

পাওয়ার প্ল্যান্ট
সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট ফটোভোল্টাইক সিস্টেম

গ্যাস টারবাইন কি?

গ্যাস টারবাইন এমন একটি আবর্তনশীল ইঞ্জিন যা দাহ্য(জ্বলন) গ্যাসের প্রবাহ থেকে শক্তি গ্রহণ করে থাকে। উদাহরন হিসেবে জেট বিমান যার ইঞ্জিন অনেক বড় আকারের হয়ে থাকে। এই ইঞ্জিন মূলত টার্বোফ্যান দ্বারা চলে থাকে। এই টার্বোফ্যান গ্যাস টারবাইনের উদাহরণ।

পাওয়ার প্ল্যান্ট
জেট বিমান টার্বোফ্যান

আমরা উপরের লেখাগুলোতে বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে আলোচনা করেছি। প্রতিটি পাওয়ার প্ল্যান্টে টারবাইন আছে শুধুমাত্র সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট ছাড়া। ষ্টীম টারবাইন, ওয়াইন্ড টারবাইন, ওয়াটার টারবাইন ইত্যাদি বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্টে শক্তি উৎপাদনে ব্যবহিত হয়ে থাকে। আর এসবের ফলিত প্রয়োগই মূলত গ্যাস টারবাইন।

গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিনে ব্লেডকে ঘোরানোর জন্য উচ্চ চাপ যুক্ত গ্যাস ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

গ্যাস টারবাইনের গঠন ও কার্যপ্রণালী

গ্যাস টারবাইনের গঠনপ্রণালী খুবই সাধারণ।

কম্প্রেসরঃ এটি অন্তর্গ্রহণ মুখ দিয়ে আসা বায়ুকে উচ্চ চাপে সংকোচিত করে।

দহন কক্ষঃ এটা মূলত ফুয়েলকে জ্বালায় এবং উচ্চ চাপ ও উচ্চ গতি সম্পন্ন গ্যাস উৎপন্ন করে।

টারবাইনঃ দহন কক্ষ থেকে প্রবাহিত অনেক বেশি চাপ ও অনেক উচ্চ গতি সম্পন্ন গ্যাস থেকে শক্তি গ্রহণ করে।

উপরের চিত্র আমরা অক্ষিয় প্রবাহ গ্যাস টারবাইন দেখতে পাচ্ছি যা সাধারণত হেলিকপ্টারের রোটরে ব্যবহিত হয়ে থাকে। এরা কিভাবে কাজ করে তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক।

  • কম্প্রেসরঃ এখানে কম্প্রেসর কোণাকৃতি একটি সিলিন্ডার এবং এর উপরে একসাথে ছোট ছোট ফ্যান ব্লেড লাগানো আছে। এই ইঞ্জিনে কম্প্রেসর বায়ু গ্রহণ করে। বায়ু যখন কম্প্রেসরে প্রবেশ করবে তখন এর চাপ অনেক কম থাকবে আর পরবর্তীতে কম্প্রেসরের মাধ্যমে বায়ুকে সঙ্কোচিত করার পর এর চাপ প্রায় ৩০ গুণ বেড়ে যাবে।
  • দহন কক্ষঃ  উচ্চ চাপ যুক্ত বায়ু দহন কক্ষে প্রবেশ করে থাকে। এরপরে ফুয়েল ইঞ্জেক্টরের বেল্ট(বলয়) থেকে স্থিরভাবে ফুয়েল ইনজেক্ট করা হয়। ফুয়েল হিসেবে কেরোসিন, জেট-ফুয়েল, প্রোপেন অথবা অন্য প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। দহন কক্ষের ভিতরে উচ্চ চাপ যুক্ত বায়ু প্রায় ১০০ মাইল/ঘন্টা বেগে এবং এই পরিবেশে দহন সম্পন্ন করতে হয় যা করা প্রায় অসম্ভব। এই সমস্যা সমাধানের জন্য দহন কক্ষে শিখা ধারক অথবা ক্যান ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ক্যান সাধারণত ফাঁপা থাকে, ছিদ্রযুক্ত ভারী ধাতব অংশ।

ইঞ্জিক্টর ক্যানের ডানপাশে থাকে এবং সংকোচিত বায়ু ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে থাকে। আর পরিত্যাক্ত গ্যাসকে ক্যানের বাম পাশ দিয়ে বের করে দেওয়া হয়ে থাকে।

  • টারবাইনঃ নিচের চিত্রে দুটি সেট টারবাইন দেখানো হয়েছে।

যার প্রথম অংশ সরাসরি কম্প্রেসরকে চালায়। টারবাইন ও কম্প্রেসর শ্যাফটের মাধ্যমে যুক্ত থাকে কাজেই তিনটি একই সাথে ঘুরবে। টারবাইনের শেষঅংশ আউটপুটের শ্যাফটের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে। এরা ইঞ্জিনের বাকি অংশ থেকে আলাদা থাকে এবং মুক্তভাবে ঘুরতে পারে।

এই অংশকে মুক্ত ঘুর্ণন অংশ ও বলা হয়ে থাকে। দহন কক্ষে দহন সম্পন্ন হবার পরে যে তপ্ত গ্যাস উৎপন্ন হয় তা মুক্ত ঘুর্ণন অংশকে ঘুরায় এবং তা প্রায় ১৫০০ হর্স পাওয়ার পর্যন্ত শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।

গ্যাস টারবাইনের সুবিধা এবং অসুবিধা

জেট বিমান, ট্যাংক ও বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্ট ইত্যাদিতে গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিন ব্যবহার করার প্রধান কারন এর ওজনের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।

গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিনের শক্তি ও ওজনের অনুপাত অন্যান্য ইঞ্জিন থেকে অনেক বেশি।

প্রধান অসুবিধা হলো এটা অনেক ব্যয়বহুল।

বয়লার নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন

আজ এই পর্যন্ত বন্ধুরা, আমরা আপনার কথা শুনতে চাই। আপনার অনুভূতি আমাদেরকে জানান, প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করবেন আর ভালো লাগলে শেয়ার করবেন ভাইয়া। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।

LEAVE A REPLY