স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম | বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে স্মার্ট গ্রিড | Smart Grid in Bangladesh

স্মার্ট গ্রিড

স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম / Smart Grid in Bangladesh – ইলেকট্রিক্যাল গ্রিড বলতে আমরা এমন একটি সিস্টেম কে বুঝি যেখানে দেশের সকল পাওয়ার প্ল্যান্টের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জমা হবে এবং প্রতিটি এলাকার প্রয়োজন মোতাবেক সেখান থেকে বিদ্যুৎ বণ্টন করা হবে।

একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে খুব সহজে ও ভালোভাবে মনিটরিং করার জন্য এর বিকল্প নেই, দেশের ক্রান্তিকালে, ব্ল্যাক-আউটের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের ক্ষয়ক্ষতিসহ বিদ্যুতের যন্ত্রপাতি রক্ষা করা সম্ভবপর হয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরুপ: যদি আমরা ভাবতাম দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ শুধু দিনাজপুরসহ এর আশেপাশের মানুষ ব্যবহার করবে, তাহলে কিছু পরিমাণ বিদ্যুৎ অব্যবহৃত থেকেই যেত, কেননা এই অঞ্চলের চাহিদা এত নয়, তখন সেই অব্যবহৃত বিদ্যুৎ — একে না যেত ব্যবহার করা, সেই সাথে না যেত অন্য অঞ্চলে পাঠানো।

এভাবে দেশের যে অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি কিন্তু বিদ্যুৎ কেন্দ্র কম সেই অঞ্চল গুলো অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হত। ইন্টার-কানেক্টেড গ্রিড সিস্টেম আছে বলেই এই সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া গিয়েছে। সেই গ্রিডকে স্মার্ট করে তোলার লক্ষ্যেই স্মার্ট গ্রিড টার্ম টি ব্যবহার করা হয়েছে। যে ৮ টি বিষয় নিয়ে এই লেখাটিতে আলোচনা করা হবেঃ

  1. স্মার্ট গ্রিড কি?
  2. স্মার্ট গ্রিড প্রচলিত গ্রিড থেকে আলাদা কিভাবে?
  3. একটি সিস্টেমকে স্মার্ট করতে হলে যা যা লাগবে?
  4. সেলফ হিলিং / স্বয়ংক্রিয় ফল্ট সমাধান।
  5. জেনারেশন এর ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড।
  6. ডিস্ট্রিবিউশন এর ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড।
  7. স্মার্ট গ্রিড ব্যবহারের সুবিধাসমূহ
  8. বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম / Smart Grid in Bangladesh ।

স্মার্ট গ্রিড কি?

স্মার্ট গ্রিড, নামের মধ্যেই স্মার্ট কথাটি রয়েছে, সে হিসেবে বুঝাই যাচ্ছে কিছুটা হলেও গতানুগতিক গ্রিডের থেকে আলাদা হবে।

স্মার্ট গ্রিড এমন একটি নেটওয়ার্ক বা সিস্টেম যেখানে সরবরাহকারী এবং গ্রহণকারীর মধ্যে উভমুখী যোগাযোগ স্থাপন করা রয়েছে, যার মাধ্যমে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের পাশাপাশি দক্ষভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করে। অবশ্যই এটি ডিজিটাল উপায়ে চালিত, যার ফলে ঘরে বসেই বিদ্যুতের ব্যবহার সম্পর্কে জানা সম্ভবপর হচ্ছে।ছোটোখাটো ফল্ট থেকে ঘরবাড়ির জিনিসপত্র রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে, ব্ল্যাকআউট অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব পর হয়েছে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি একটি কম্পিউটারাইজড বৈদ্যুতিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা যা এর সাথে সংযুক্ত থাকা সকল উৎপাদনকারীসহ সকল ব্যবহারকারীর কার্যকলাপ একীভূত করতে পারে, যার একটাই লক্ষ্যঃ সাশ্রয়ী,  নিরাপদ ও টেকশই বিদ্যুৎ গ্রাহকের দুয়ারে পৌছে দেওয়া।

এছাড়াও নেট মিটারিং এর মাধ্যমে একজন গ্রাহক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে সরাসরি জড়িত হতে পারবেন, তিনি নিজের প্রয়োজনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, অবশিষ্ট অংশ গ্রিডের কাছে বিক্রি করে কিছু মুনাফা লাভ করতে পারবেন। যেহেতু উভমুখী যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। এই ক্ষেত্রে একজন গ্রাহককে প্রজিউমার (PROSUMER= CONSUMER+PRODUCER) বলা হবে, কেননা সে একই সাথে গ্রাহক এবং উৎপাদক ও।

স্মার্ট গ্রিড প্রচলিত গ্রিড থেকে আলাদা কিভাবে?

Existing GridSmart Grid
ElectromechanicalDigital
One-way communicationTwo-way communication
Centralized generationDistributed generation
Few sensorsSensor throughout
Manual monitoringSelf-monitoring
Manual restorationSelf-healing
Failure and blackoutsAdaptive and islanding
Limited controlPervasive control
Few customers choicesMany customer choices

একটি সিস্টেমকে স্মার্ট করতে হলে যা যা লাগবে?

স্মার্ট গ্রিড
  • স্মার্ট মিটার
  • স্মার্ট হোম
  • স্মার্ট জেনারেশন ব্যবস্থা
  • স্মার্ট ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থা
  • স্মার্ট সাবস্টেশন
  • গ্রাহকের অংশগ্রহন
  • গ্রিন এনার্জি সোর্স থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযোগকরণ

স্মার্ট গ্রিড হতে হলে যে চারটি শর্ত পূরণ করতে হবে

লোড হ্যান্ডেল করা: 

গ্রিডের টোটাল লোড কিন্তু সবসময় একই থাকে না, প্রতি সেকেন্ডেই চেঞ্জ হতে থাকে। অফ টাইম কিংবা পিক টাইমে, স্মার্ট গ্রিড গ্রাহককে কিছু সময়ের জন্যে বিদ্যুৎ কম ব্যবহার করার জন্যে উপদেশ দিতে পারে।

ডিমান্ড রেসপন্স সাপোর্ট:

কিভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে একজন গ্রাহক তার বিল কমাতে পারে সে বিষয়ে স্বয়ংক্রিয় উপায়ে জানাতে পারে, ফলে বিদ্যুৎ অপচয় রোধ হবে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের বিকেন্দ্রীকরণঃ

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে একজন ব্যবহারকারী তার প্রয়োজন মোতাবেক যেকোন উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন। এই পয়েন্টে একজন গ্রাহক প্রজিউমার হিসেবে বিবেচিত হবেন।

নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎের নিশ্চয়তা: 

এমনভাবে সিস্টেমকে রান করতে হবে যাতে একজন গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তার আস্থা ফিরে পায়, প্র‍য়োজনের মুহূর্তে যাতে বিদ্যুৎ এর অভাবে না পড়তে হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

জেনারেশন এর ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড

ধরি একটি অঞ্চলের চাহিদা দৈনিক ৫০ মেগাওয়াট যা এর পাশের এলাকার পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ করা হয়, কিন্তু সেই চাহিদা যেহেতু সবসময় একই থাকে না, সেহেতু কি বাকি বিদ্যুৎ নষ্ট হয়ে যায়??

উত্তর: না, যখন যেরকম চাহিদা, তখন স্মার্ট গ্রিডের মাধ্যমে চাহিদা জেনে নিয়ে জেনারেটিং প্ল্যান্টে সে অনুযায়ী উৎপাদন করতে বলা হয়, ফলে একাধারে অপচয় রোধ হয়, সেই সাথে অযথা খরচ ও এড়ানো যায়।

SCADA এর সাহায্যে কোন অঞ্চলে কত ডিমান্ড তা জেনে নিয়ে উৎপাদন করা হয়, ফলে অযথা অপচয় হয় না, যেটুকু দরকার শুধু সেটুকুই উৎপাদিত হয়। যা সিস্টেমের নির্ভর‍যোগ্যতা বাড়াতে অনেকগুনে সাহায্য করে।

সব সাবস্টেশনে যোগাযোগ করে চাহিদা জেনে নিয়ে উৎপাদনে যাওয়া হয়। সেটা অবশ্যই অটোমেটিক উপায়ে, ফলে লোড শেয়ারিং ভালোভাবে করা সম্ভব হয়  এবং লোড শেডিং এড়ানো যায়।

ডিস্ট্রিবিউশন এর ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড

কোনো গ্রাহক এই মুহূর্তে কতটুকু লোড ব্যবহার করছেন সেটা মনিটরিং এর মাধ্যমে সেই এলাকার সাবস্টেশন লোড ক্যাপাসিটি জেনে নিয়ে ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টার (NLDC) এ জানায়, ফলে সেভাবে সামগ্রিক জেনারেশন সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।

মাঝে মধ্যে পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে / রক্ষণাবেক্ষণ এর কাজে অনেক ইউনিট বন্ধ থাকলে লোড শেডিং এর বিষয়টা চলে আসে।

স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম টা দেশে অ্যাপ্লাই করতে পারলে রিয়েল টাইম মনিটরিং এর মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ অবস্থা, গ্রাহকের বিদ্যুৎ চাহিদা, অটোমেটিক ফল্ট ক্লিয়ারিং ইত্যাদির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় উপায়ে কন্ট্রোল রুমে বসেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এছাড়াও ভারত, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির প্রসেস টা আরো দক্ষভাবে সামলানো সম্ভব হবে।

সেলফ হিলিং / স্বয়ংক্রিয় ভাবে ফল্ট ক্লিয়ার করা

স্মার্ট গ্রিড টার্মটা বলতে গেলেই সেল্ফ হিলিং(SELF HEALING) টার্মটা ব্যবহার করতেই হবে, এর দ্বারা আমরা বুঝতে পারি যে,  কোনো কারণে লাইনে / ফেজে / গ্রাউন্ডে ফল্ট হলে, নিজে নিজেই নিজেকে সক্রিয় লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে মূল লাইনকে রক্ষা করতে, এবং ফল্ট ক্লিয়ার হওয়া মাত্র পূনরায় সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হবে, কোনোরকম লাইনম্যানের সাহায্য ছাড়াই।

কম্পিউটার মনিটর এ দেখা যাবে, কি ফল্ট হয়েছে, এবং কি মেজারমেন্ট নিয়েছে সিস্টেম এটা মিনিমাইজ করার জন্যে।

কোনো কারণে কোনো জেনারেশন প্ল্যান্টে সমস্যা দেখা দিলে তাকে গ্রিড থেকে আলাদা করে দিয়ে গ্রিড কে রক্ষার কাজটিও এই সিস্টেমে করা হয়ে থাকে। প্রতিটি জেনেরেটিং প্ল্যান্ট কে একে অপরের সাথে সিনক্রনাইজ করার বিষয়টাও স্মার্ট গ্রিডের মাধ্যমে সূচারুরুপে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

ফলে একাধারে সিস্টেম এর নির্ভরযোগ্যতা বাড়ে, এবং গ্রাহক ব্যবহারে আগ্রহী হয়।

IoT এবং মেশিন লার্নিং এর মাধ্যমে এই স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করে তোলা সম্ভব, এবং দেশবাসীকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব, সেই সাথে বিদ্যুত অপচয় কমিয়ে এনে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব।

স্মার্ট গ্রিড ব্যবহারের সুবিধাসমূহ

  • এনার্জি লস কমে আসবে, মিটার রিডিং ডিজিটাল হলে কারচুপি বন্ধ হয়ে যাবে, অবৈধ সংযোগ খুব সহজেই বিচ্ছিন্ন করা যাবে।
  • মেইন্টেনেন্স খরচ কমে আসবে।
  • পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন চার্জ কমবে, ফলে গ্রাহক কে জরিমানা গুণতে হবে না।
  • কার্বন ডাই অক্সাইড এর নির্গমন কমবে।
  • অপারেশনাল খরচ কমবে।
  • পাওয়ার কাট এর মত দূর্ঘটনা কমে আসবে সেই সাথে এর সময়কাল।
  • সিস্টেম লস কমে আসবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে স্মার্ট গ্রিড / Smart Grid in Bangladesh

বাংলাদেশে ডিপিডিসি প্রথম স্মার্ট গ্রিড স্থাপন করতে যাচ্ছে- ধানমন্ডি, আজিমপুর, গ্রিন রোড, লালমাটিয়া, আসাদ গেট সংলগ্ন এলাকায়, যার ফলে কোনো জায়গায় ফল্ট হলে খুব দ্রুত খুজে বের করা যাবে এবং সমস্যা সমাধান করা যাবে, কোনো এলাকায় কিংবা বাড়িতে পাওয়ার চলে গেলে সেন্সর, অটোমেটিক রেস্পন্স মেকানিজম এর মাধ্যমে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাবে, কারণ এটি পুরোপুরি কম্পিউটার-কন্ট্রোল্ড।

এই টেকনোলজি ব্যবহার করে গ্রাহক ইন্টারনেট প্যাক এর মত ইলেক্ট্রিসিটি প্যাক(পাওয়ার প্ল্যান) সিলেক্ট করতে পারবেন, ফলে প্রয়োজন মত যার যেটা দরকার তিনি সেটা উপভোগ করতে পারবেন।

ইলেক্ট্রিক মিটার বক্সে সিমকার্ড এর মত একটি কার্ড থাকবে যা প্রতি ১৫ মিনিট পর পর সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্ড এ ডাটা পাঠাবে,  যে কতটুকু বিদ্যুৎ গ্রহন করা হয়েছে এই সময়ে।

এছাড়াও সারা শহরে এই সিস্টেম চালু করলে অফ লোড ও পিক লোড চালানোর খরচ আলাদা ভাবে জানা সম্ভব হবে, যার ফলে গ্রাহক বুঝতে পারবেন যে কোন সময়ে কোন লোড কতটুকু চালালে তার সাশ্রয় হবে।

স্মার্ট গ্রিডের এই প্রজেক্টে দাতা সংস্থা FRANCE DEVELOPMENT AGENCY (FDA) ১২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে রাজি হয়েছে, পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে এই প্রজেক্টের কাজ এই ৫এলাকায় সাবস্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হবে, মেইন প্রজেক্টের আলোকে  শ্যামপুর ও মোহাম্মদী স্টিল এরিয়ায় ১৩২ কেভি লাইন স্থাপন করা হবে,  এবং লালবাগ, কল্যাণপুর,  মাদারটেক এ ৩৩ কেভি এর তিনটি সাবস্টেশন স্থাপন করা হবে।

সবকিছুই স্মার্ট হতে হবে, তাহলেই হাতের ছোয়ায় বদলে যাবে, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার দিন শেষ হয়ে আসবে, ঘরে বসেই বিদ্যুৎ সম্পর্কিত সব তথ্য মনিটর এ দেখা যাবে।

পরিশেষে না বললেই নয়, স্মার্ট গ্রিড আমাদের মতো দেশের জন্যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় , দেশের বিদ্যুৎ খাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এর বিকল্প নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here