সহজ পদ্ধতিতে ডায়োড ও ট্রানজিস্টরের লেগ বের করুন এবং ভুল-ত্রুটি নির্ণয় করুন

0
411
ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

আমরা যারা ইলেকট্রনিক্স বা ইলেক্ট্রিক্যালের ছাত্র-ছাত্রী তারা মূলত ট্রানজিস্টর এবং ডায়োড ভালো ভাবেই জেনে থাকার কথা। ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে কাজ করি কিন্তু ডায়োড সম্বন্ধে জানি না এমন মানুষ নেই বললেই চলে।

কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না কিভাবে ডায়োড এবং ট্রানজিস্টর টেস্ট করবো এবং ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয় করবো। কোন ক্রমেই সার্কিটে ডায়োড বা ট্রানজিস্টর স্থাপনে ভুল করা যাবে না।

ডায়োড সম্বন্ধে বিস্তারিত পড়ুন

অনেক ক্ষেত্রে ভুল হলে সার্কিট পুড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে, এছাড়া ডাটা শীট দেখেও সব ক্ষেত্রে ট্রানজিস্টরের লেগ সঠিক ভাবে বের করা  যায় না। ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয় করতে হলে আমাদের কিছু বিষয় অনুসরণ করতে হবে।

ট্রানজিস্টরের লেগ সহজে বের করতে হলে আগে জানতে হবে ডায়োডের লেগ বের করা। কারণ আমরা জানি ট্রানজিস্টরের আভ্যন্তরীণ দুই বা ততোধিক ডায়োডের সমষ্টি। নিচের চিত্র দেখলেই আমরা বুঝতে পারবো।

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

ছবিটিতে ভালোভাবে দেখলে বুঝতে পারবেন যে ট্রাঞ্জিস্টরের প্রতিটি লেগে ডায়োড সংযুক্ত আছে।

তাহলে চলুন দেখে নেই ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয় এবং টেস্টিং এ আর কি কি শিখতে যাচ্ছি আমরাঃ

  1. ডায়োডের লেগ সনাক্ত / এনোড-ক্যাথোড সনাক্তকরণ পদ্ধতি।
  2. ডায়োড ভালো না খারাপ টেস্ট পদ্ধতি।
  3. ট্রাঞ্জিস্টরের লেগ সনাক্ত / বেজ, ইমিটার, কালেক্টর সহজে বের করার পদ্ধতি।
  4. এন পি এন ট্রাঞ্জিস্টরের ক্ষেত্রে বেজ বের করার সহজ পদ্ধতি।
  5. পি এন পি ট্রাঞ্জিস্টরের ক্ষেত্রে বেজ বের করার সহজ পদ্ধতি।
  6. এবার উভয় ট্রাঞ্জিস্টরের ক্ষেত্রে কালেক্টর এবং ইমিটার নির্ণয়।
  7. ট্রাঞ্জিস্টর ভালো না খারাপ টেস্টিং পদ্ধতি।

ডায়োডের লেগ সনাক্ত / এনোড-ক্যাথোড সনাক্তকরণ পদ্ধতি

ডায়োডের লেগ সনাক্ত বা এনোড – ক্যাথোড সনাক্তকরণ পদ্ধতি অনেক সহজ। যে কেও ডায়োড দেখলেই বুঝতে পারবে কোন প্রান্ত এনোড এবং কোন প্রান্ত ক্যাথোড। এজন্য নিচের চিত্র মন দিয়ে দেখলেই পারবেন।

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

ডায়োডের যে অংশে সাদা দাগ রয়েছে সে অংশ হচ্ছে ডায়োডের ক্যাথোড প্রান্ত আর যে অংশে সাদা দাগ নেই সে অংশ হচ্ছে ডায়োডের ক্যাথোড প্রান্ত যা চিত্রে দেখানো হয়েছে।

ডায়োড ভালো না খারাপ টেস্ট পদ্ধতিঃ

ডায়োড টেস্ট করার পদ্ধতি একদম পানির মত সহজ। একটু মন দিয়ে লক্ষ্য করলে যে কেউ এটি পারবে। ডায়োডের টেস্ট করার জন্য ডিজিটাল বা এনালগ যে কোন মাল্টিমিটার হলেই চলবে। তবে ডিজিটাল/এনালগ মাল্টিমিটারে ডায়োড/রেজিস্ট্যান্স সিলেক্টর আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে।

বাজারে যে মাল্টিমিটার পাওয়া যায় তার বেশিরভাগ গুলোতেই ডায়োড, রেজিস্ট্যান্স অপশন থাকে। মিটারের ওহম বা রেজিস্ট্যান্স মাপার অপশন দিয়ে ডায়োড পরিমাপ করা যাবে এই পদ্ধতিতেই। তাহলে ধাপগুলো একটু দেখে নিনঃ

  • প্রথমেই মাল্টিমিটারের সিলেক্টরকে ডায়োডে/রেজিস্ট্যান্সে নিয়ে নিতে হবে। বুঝার সুবিধার্থে নিচে চিত্র দেওয়া হলো।

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

  • এবার আমরা ডায়োডের ফরোয়ার্ড টেস্ট করবো অর্থাৎ ডায়োডের এনোডের সাথে মাল্টিমিটারের পজেটিভ প্রুব এবং ক্যাথোডের সাথে নেগেটিভ প্রুভ যুক্ত করতে হবে চিত্রের ন্যায়।

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

এখানে 0.23v রিডিং দেখাচ্ছে যার অর্থ হলো ডায়োডটি আনুমানিক 0.23 ভোল্ট ড্রপ করবে যেটা আনলোড অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি আর এই অবস্থায় ডায়োডের মধ্য দিয়ে খুব কম পরিমানে কারেন্ট প্রবাহিত হবে(1mA/2mA)।

সিলিকন ডায়োডের ক্ষেত্রে লোড অবস্থায় ভোল্টেজ ড্রপ ০.৭ পর্যন্ত হবে এবং জার্মেনিয়ামের ক্ষেত্রে ০.৩ পর্যন্ত হবে।

ওহমমিটার দিয়ে মাপলে আনুমানিক একটা রেজিস্ট্যান্স দেখাবে যেটা খুবই কম। এটা ডায়নামিক রোধ যা সার্কিটে চালু অবস্থায় কারেন্ট প্রবাহের উপর নির্ভর করে এই রোধ কমতে থাকে। এক্ষেত্রে কারেন্ট প্রবাহ যত বাড়বে রোধ তত কমতে এটাই মূলত ডায়োডের ধর্ম।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এনালগ মাল্টিমিটারের ক্ষেত্রে উল্টো করে ধরতে হবে অর্থাৎ লাল প্রোবের জায়গায় কালো প্রোব এবং কালো প্রোবের জায়গায় লাল প্রোব ধরতে হবে।

তবে কিছু কিছু এনলাগ মাল্টিমিটার এখন ডিজিটাল মাল্টিমিটারকে অনুসরণ করে তৈরি করা হয়। সেক্ষেত্রে ম্যানুয়াল দেখে নিতে হবে কোন প্রোবটি কি।

  • এখন আমরা ডায়োডের রিভার্স টেস্ট করবো অর্থাৎ এর জন্য আগের প্রক্রিয়ার উল্টো করবো। এর মানে এখন লাল প্রোব ধরবো ডায়োডের সাদা(ক্যাথোডে) অংশে এবং কালা প্রোব ধরবো বিপরীত অংশে(এনোডে)।

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

চিত্রে মাল্টিমিটারের ডিসপ্লে তে দেখা  যাচ্ছে যে ০ মান অর্থাৎ কোন পরিমান ভোল্টেজ প্রবাহিত হচ্ছে না। এটাই স্বাভাবিক যেহেতু ডায়োড শুধুমাত্র একমুখী ডিভাইস তাই এই ডায়োডটি ভালো বলে ধরে নেওয়া হয়। ওহমে মাপলে এক্ষেত্রে কোণ মান দেখাবে না।

ট্রাঞ্জিস্টরের লেগ সনাক্ত / বেজ সহজে বের করার পদ্ধতি:

আমরা যে ট্রাঞ্জিস্টর বাজার থেকে কিনে থাকি সেই ট্রাঞ্জিস্টরের মডেল নাম্বার জানা থাকলে খুব সহজে গুগোল থেকে সার্চ করে আমরা ট্রাঞ্জিস্টরটির বেজ, ইমিটার, কালেক্টর জানতে পারবো।

এই সহজ পদ্ধতির একটি সমস্যা আছে, বিভিন্ন প্রস্তুতকারক কোম্পানি প্যাকেজভেদে ট্রাঞ্জিস্টরের পিনআউট অনেক সময় ভিন্ন রকম হয়। নিচের চিত্র দেখলে বুঝতে পারবেনঃ ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

চিত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে BC547 ট্রাঞ্জিস্টর এবং 2N2222 ট্রাঞ্জিস্টর দুটির দুই রকমের পিন আউট। আমরা যারা নতুন আজ করি তাদের ক্ষেত্রে এটি বিশাল এক দরনের সমস্যা আর যদি ভুলভাবে লাগিয়ে ফেলি তাহলে তো কাজ করবেই না।

এই ক্ষেত্রে হবিস্টদের প্রতি আমার অনুরোধ অবশ্যই মাল্টিমিটার দিয়ে ট্রাঞ্জিস্টরের লেগ বের করবার। শুধু ট্রাঞ্জিস্টরের ক্ষেত্রে নয় বরং যেসকল ইকুয়েপমেন্ট টেস্ট করা যায় সেগুলো নিয়ে কাজ করার পূর্বে অবশ্যই টেস্ট করে নিবেন।

আমরা NPN এবং PNP উভয় ক্ষেত্রে ট্রাঞ্জিস্টরের বেজ, ইমিটার, কালেক্টর নির্নয় করবো। এক্ষেত্রে কাজের সুবিধার্থে আমরা প্রথমে মাল্টিমিটার দিয়ে ট্রাঞ্জিস্টরের বেজ নির্ণয় করবো। এর পরে কালেক্টর ও ইমিটার নির্ণয় করবো। নতুনদের বুঝার সুবিধার্থে আমরা ধাপে ধাপে তা বর্ণনা করেছি।

এন পি এন ট্রাঞ্জিস্টরের ক্ষেত্রে বেজ বের করার সহজ পদ্ধতি

বেজ নির্ণয়
  • উপরোক্ত ডায়োডের ক্ষেত্রে যেভাবে সিলেক্টর সেট করা হয়েছিলো সেইভাবেই সেট করা থাকবে অর্থাৎ সিলেক্টর নবকে ডায়োড/ওহমে রাখতে হবে।
  • এবার ট্রাঞ্জিস্টরের তিনটি প্রান্তের যেকোন এক প্রান্তকে বেজ হিসেবে ধরে অনুমান করে পরীক্ষা করি।
  • মাল্টিমিটারের পজিটিভ প্রোব(লাল রঙের প্রোব)যে প্রান্তকে বেজ অনুমান করা হয়েছে তার সাথে লাগিয়ে এবং নেগেটিভ প্রোব(কালো রঙের প্রোব) অন্য দুইটি প্রান্তে লাগিয়ে দেখতে হবে।
  • একই পরীক্ষা ট্রাঞ্জিস্টরের অপর দুটি লেগের ক্ষেত্রে করতে হবে অর্থাৎ অপর দুটি লেগ কে বেজ অনুমান করে উপরোক্ত নিয়মে লাগাতে হবে। নিচের ছবিটি লক্ষ্য করুন-

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

  • যদি উভয় লেগের ক্ষেত্রে কিছু রেজিস্ট্যান্স দেখায় তাহলে আমাদের বুঝতে হবে ঐ কমন লেগটিই ট্রাঞ্জিস্টরের বেজ। শর্ট হলে রেজিস্ট্যান্স শূন্য দেখাবে।

পি এন পি ট্রাঞ্জিস্টরের ক্ষেত্রে বেজ বের করার সহজ পদ্ধতি

বেজ নির্ণয়
  • আগের মতোই ট্রাঞ্জিস্টরের সিলেক্টর নবকে রেজিস্ট্যান্স/ডায়োড মাপার জন্য সেট করতে হবে।
  • এবার ট্রাঞ্জিস্টরের তিনটি প্রান্তের যেকোন একটিকে পিএনপি ট্রাঞ্জিস্টরের বেজ অনুমান করতে হবে এবং তা পরীক্ষা করতে হবে।
  • এর জন্য মাল্টিমিটারের নেগেটিভ প্রোব (কালো রঙের) যে প্রান্তকে বেজ অনুমান করা হয়েছে তার সাথে লাগিয়ে এবং পজেটিভ প্রোব(লাল রঙের প্রোব) অন্য দুইটি প্রান্তে লাগিয়ে দেখতে হবে।
  • একই দরনের পরীক্ষা অপর দুটি লেগের ক্ষেত্রেও করতে হবে। অর্থাৎ অপর দুটি লেগ কে বেজ অনুমান করে উপরোক্ত নিয়মে লাগাতে হবে।
  • যদি উভয় লেগের ক্ষেত্রে কিছু রেজিস্ট্যান্স দেখায় তাহলে আমাদের বুঝতে হবে ঐ কমন লেগটিই ট্রাঞ্জিস্টরের বেজ। শর্ট হলে রেজিস্ট্যান্স শূন্য দেখাবে।

উভয় ট্রাঞ্জিস্টরের ক্ষেত্রে কালেক্টর এবং ইমিটার নির্ণয়

বেজ নির্ণয় করতে পারলে এটি বেশ সহজ কাজ। এটিও আমরা ডিজিটাল মাল্টিমিটার দিয়ে সিলেক্টর নবকে ডায়োড/রেজিস্ট্যান্স অবস্থানে রেখে খুব সহজে বের করতে পারি।

ট্রাঞ্জিস্টর সম্বন্ধে বিস্তারিত পড়ুন 

  1. বেজ থেকে উভয় লেগের রেজিস্ট্যান্স তুলনা করতে হবে মাল্টিমিটার দিয়ে।
  2. যে লেগের রেজিস্ট্যান্স বেশি হবে সেটি উক্ত ট্রাঞ্জিস্টরের ইমিটার
  3. অপরদিকে যে লেগের রেজিস্ট্যান্স কম দেখাবে সেটি কালেক্টর

এনালগ মাল্টিমিটার দিয়ে এটি সনাক্ত করা বেশ কঠিন এবং দুরূহ কাজ কারন এই রেজিস্ট্যান্সের মান মাত্র কয়েক ওহম হয়ে থাকে। যার ফলে এনালগ মাল্টিমিটার দিয়ে কাটার পরিবর্তন তেমন বুঝা যায় না

এছাড়া এখনকার সব এনালগ মাল্টিমিটারে ট্রাঞ্জিস্টর পরীক্ষা করার আলাদা অপশন আছে।

আমরা যে ট্রাঞ্জিস্টরের দিয়ে পরীক্ষা করেছি সেটির ফলাফল:

  • আমরা ট্রাঞ্জিস্টরের একটি প্রান্তে(মাজখানের পায়ে) লাল প্রোব  ধরার পর বাকি ২ পায়েই রেজিস্ট্যান্স পেয়েছি এর মানে এটি এন পি এন (NPN) টাইপ ট্রাঞ্জিস্টর এবং মাঝ খানের পা টি বেজ
  • মাজখানের বেজ থেকে বাম দিকের লেগে মাল্টিমিটার ধরে যে রিডিং পাওয়া গেছে এবং মাঝখানে বেজ থেকে ডান দিকের লেগে মাল্টিমিটারে ধরে রিডিং পাওয়া গেছে তাদের মাঝে তুলনা করতে হবে।
  • তাহলে আমাদের ভ্যালু অনুসারে বেজ টু বাম সাইটের লেগ=৬৪৯ এবং বেজ টু ডান সাইডের লেগ = ৬৫৫ অর্থাৎ বাম সাইডের লেগ কালেক্টর এবং ডান সাইডের লেগ ইমিটার।

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয়

ট্রাঞ্জিস্টর ভালো না খারাপ টেস্টিং পদ্ধতিঃ

মিটারের কাটাটি যদি অন্য দুইটি লিডের কোনটির ক্ষেত্রে না নড়ে তাহলে ট্রানজিস্টরটি ওপেন যেটা নষ্ট।মিটারের কাটাটি যদি সব টেস্টের ক্ষেত্রে নড়ে তাহলে ট্রানজিস্টরটি শর্ট নষ্ট।
মিটারের কাটাটি যদি  কোনো একটি টেস্টের ক্ষেত্রটি হাল্কা নড়ে তাহলে ট্রানজিস্টরটি লিক নষ্ট।

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয় ভিডিওঃ

ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয় সম্পর্কে আজকে এই পর্যন্ত। আপনাদের ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয় বিষয়ে কোন প্রশ্ন থাকলে আমাদেরকে কমেন্টে জিজ্ঞাস করতে পারেন।

আশা করছি আমাদের ডায়োড ও ট্রানজিস্টর লেগ নির্ণয় লেখা নতুন হবিস্টদের উপকারে আসবে তাহলে আমাদের সার্থকতা।

ডায়োড সম্বন্ধে বিস্তারিত পড়ুন

ট্রাঞ্জিস্টর সম্বন্ধে বিস্তারিত পড়ুন 

LEAVE A REPLY