বিদ্যুৎ নিয়ে জনমনের ভ্রান্ত ধারণা এবং সমাধান যা জেনে রাখা জরুরী

আমাদের জনজীবনের জন্য বিদ্যুৎ অতিপ্রয়োজনীয় জিনিস। বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন অচল। গরমে সিলিং ফ্যান বা এয়ার কন্ডিশন ছাড়া এক মুহূর্তও চলেনা, মোবাইল ছাড়া এক মিনিট যেন এক বছরের মত, অফিস আদালত, ব্যাংক, কারখানা, হাসপাতাল বিদ্যুৎ ছাড়া এক মুহূর্তও চলতে পারবেনা। তবে এই বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের মনে অনেক ভূল ধারণা রয়েছে। সাধারণ মানুষের কথা বাদই দিলাম অনেক প্রকৌশলের ছাত্রছাত্রীরাও এসব ভূল ধারণা পোষণ করে। আজ এমন ই কয়েকটি ভ্রান্ত ধারণা ও সমাধান আপনাদের নিকট তুলে ধরব।

আমরা বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক দূর্ঘটনায় ২২০ ভোল্টে শক অনুভব করি

এই ভূল ধারণা আমাদের অনেকের মধ্যে আছে। বাস্তবে আমরা কিন্তু ২২০ ভোল্টের শক অনুভব করিনা। আমরা ৩১১ ভোল্টের শক অনুভব করি।

কিভাবে?

আমরা বাসাবাড়িতে বিভিন্ন লোডের ভোল্টেজ ২২০ বলি সেটি মূলত rms ভোল্টেজ। প্রাণীদেহে শক অনুভব হয় ভোল্টেজ এর peak value এর জন্য।

rms value কাকে বলে?

কোন সার্কিটে ডিসি সোর্স এপ্লাই করলে যে পরিমাণ তাপ তৈরি হয় সেই পরিমাণ তাপ যদি কোন এসি সোর্স তৈরি করতে পারে তাহলে সেই এসি সোর্সের মানকে rms value বলে। rms value এবং peak value এর সম্পর্ক নিম্নরুপ

বিদ্যুৎ ; rms value এবং peak value

এই সূত্রানুসারে, বাসাবাড়িতে সরবরাহকৃত rms ভোল্টেজ ২২০ ভোল্ট হলে, তার peak value হবে , Vo = 1.4142 x 220 = 311.124 volt অর্থাৎ, বাসাবাড়িতে আমরা যে শক অনুভব করি তার মাত্রা ৩১১ ভোল্ট। আর এই ক্ষেত্রে এসি প্রবাহের peak to peak value ৬২২ ভোল্ট

বিদ্যুৎ ; বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক শকের মাত্রা
বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক শকের মাত্রা

সুইচ বন্ধ করলে বিদ্যুৎ শক্তি থাকেনা

এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভূল। সুইচ অফ করার পরেও লোডে কিছুক্ষণ বিদ্যুৎ শক্তি মজুদ থাকে। এজন্যই অনেক সময় বাতির সুইচ অফ করে দেয়ার পরেও তা কিছুক্ষণ ধরে মৃদু আলো দিতে দেখা যায়। ইন্ডাক্টিভ, ক্যাপাসিটিভ লোডসমূহ তুলনামূলক বেশি সময় ধরে শক্তি মজুদ করে রাখতে পারে।

বিদ্যুৎ ; সুইচ বন্ধ করার পরেও বাতিতে সঞ্চিত শক্তি
সুইচ বন্ধ করার পরেও বাতিতে সঞ্চিত শক্তি

বিদ্যুৎ শুধুমাত্র স্তন্যপায়ীদের শক করে

অনেকে মনে করেন বিদ্যুৎ শুধু স্তন্যপায়ীদের শক করে। অনেকে এটাকে পাওয়ার লাইনে পাখি শক না খাওয়ার কারণ হিসেবেও মনে করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতা ভিন্ন। বিদ্যুৎ শক খাওয়ার শর্ত পূরণ করলে অর্থাৎ যেকোন পশুপাখির মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বর্তনী পূর্ণ হতে পারলে বিদ্যুৎ কাউকে ছাড়বেনা।

বিদ্যুৎ ; পাওয়ার লাইনে ঝুলন্ত পাখি
পাওয়ার লাইনে ঝুলন্ত পাখি

রাবার, কাঠ উত্তম অন্তরক

একটা জিনিস তড়িৎ প্রকৌশলের ছাত্র হিসেবে সবার মনে রাখা উচিত যে, কোন অন্তরক সর্বদা অন্তরকের ন্যায় আচরণ করতে নাও পারে। Breakdown Strength অতিক্রম করলেই অন্তরক পরিবাহীর ন্যায় আচরণ করে।

Breakdown Strength কি?

একটি নির্দিষ্ট ভোল্টেজ লেবেল পর্যন্ত একটি অন্তরক তার নিজ ধর্ম বজায় রাখতে পারে। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করলে অন্তরকটি পরিবাহীর ন্যায় আচরণ করে। যে ভোল্টেজ লেবেল পর্যন্ত অন্তরকটি পরিবাহীর ন্যায় আচরণ করে তাকে বলে breakdown strength.

বিদ্যুৎ ; রাবার
রাবার

পানি বিদ্যুৎ কুপরিবাহী

অনেকেই মনে করেন পানি বিদ্যুৎ পরিবহন করেনা। এই ধারণাটি আংশিক সত্য। বিশুদ্ধ পানি বিদ্যুৎ পরিবহন করেনা কিন্তু পানিতে যদি কোন রাসায়নিক পদার্থ (এসিড, ক্ষার) যুক্ত করা হয় তাহলে তা বিদ্যুৎ পরিবহন করবে।

বিদ্যুৎ  ; পানি
পানি

মোবাইলে ফুল চার্জ হলেও বিদ্যুৎ প্রবাহ চলতে থাকে

এই ধারণাটি পুরোপুরিভাবে ভূল নয় আবার সঠিকও নয়। এই বিষয়টি নির্ভর করে মোবাইলটি কোন কন্ডিশনে চার্জ দেয়া হয়েছে।

যদি মোবাইলটি পাওয়ার অফ করে বা ফ্লাইট অন মোডে চার্জ দেয়া হয়

এই অবস্থায় পুরোপুরিভাবে চার্জ হওয়ার পর সেখানে আর বিদ্যুৎ প্রবাহিত হবেনা। আমরা জানি, দুটি প্রান্তের ভোল্টেজ পার্থক্য থাকলেই কেবল সেখানে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। কিন্তু এখানে সোর্স ও লোডের ভোল্টেজ পার্থক্য শুণ্য। কারণ চার্জারের রেক্টিফায়ার সাপ্লাই দিচ্ছে 4 ভোল্ট এবং আমার ব্যাটারি 4 ভোল্ট।

যদি পাওয়ার অন রেখে, ওয়াইফাই, ডাটা অন রেখে চার্জে দেয়া হয়

সেক্ষেত্রে ব্যাটারি ১০০% চার্জ হলেও বিদ্যুৎ প্রবাহিত হবে। কারণ নেটওয়ার্ক উঠানামায় চার্জ ক্ষয় হওয়ার দরুণ ভোল্টেজ পার্থক্য পুরোপুরিভাবে শূণ্য হয়না। তাই সামান্য পরিমাণে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হবে।

বিদ্যুৎ ; ফুল চার্জড মোবাইল ব্যাটারি
ফুল চার্জড মোবাইল ব্যাটারি

নিউট্রাল এবং আর্থিং এক জিনিস

এই ধারণা পোষণ করাটা অস্বাভাবিক কিছু না। কারন, দুই পথ দিয়েই কারেন্ট পালিয়ে যায়। তাই খটকা লাগতেই পারে। দুটোই কারেন্ট-এর বের হওয়ার পথ হলেও তাদের মধ্যে অবশ্যই ফারাক আছে। নিউট্রাল হল সেই পয়েন্ট যেটা দিয়ে কারেন্ট Exit করে। আর নিউট্রাল ছাড়া সার্কিট কমপ্লিট হবেনা। আর এ পথ দিয়ে সর্বদাই কারেন্ট return back করে। আর আর্থিং হচ্ছে আমার প্রটেকশন।

যদি সার্কিটে কোন সার্জ কারেন্ট থাকে তখন সেটা আর্থিং এর মাধ্যমে ভূমিতে চলে যায়। এ ক্ষেত্রে আর্থিং ওয়্যার শর্ট সার্কিট এর ন্যায় আচরণ করে। তাই নিউট্রাল হল মূল কারেন্টের এবং আর্থিং হল অযাচিত কারেন্টের বের হওয়ার পথ। মাঝেমধ্যে নিউট্রাল এবং আর্থিং বডি একসাথে থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। বিশেষ করে সাবস্টেশান গুলার নিউট্রাল পয়েন্ট আর্থ করা থাকে যাতে সিস্টেমে overflow না হয়। আর আমরা যে 2pin প্লাগ ব্যবহার করি যেখানে নিউট্রাল & আর্থিং এর জন্য একটি Wire use করা হয় আর 3 pin plug গুলাতে নিউট্রাল & আর্থিং Wire আলাদা থাকে।

বিদ্যুৎ ; নিউট্রাল ও আর্থিং এর পার্থক্য
নিউট্রাল এবং আর্থিং এর পার্থক্য

নিউট্রাল পয়েন্ট এর ভোল্টেজ শূন্য

একথাটা বললে ভূল হবে। সেখানে কিছু পরিমাণ ভোল্টেজ থাকে। যেটা নগণ্য। পারিপার্শ্বিক এর সাপেক্ষে শূণ্য ধরে নেয়া হয়। কারন কি?

আচ্ছা আপনাকে যদি কোন একটি সার্কিটে একটা পয়েন্ট এর ভোল্টেজ হিসেব করতে দেয়া হয় আপনি কি করবেন? নিশ্চয় একটি Actual point এবং অন্য একটা রেফারেন্স Point এর মাঝে ভোল্টমিটার ধরবেন? Reference point টির ভোল্টেজ যদি শূন্য হয় তাহলে তো Actual voltage Calculation এ আমাদের সুবিধা হয়। ব্যাপারটা আরো ক্লিয়ার করি।

ধরুন, আমরা বলি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পর্বতের উচ্চতা ৫০০ ফুট। এখানে সমুদ্রের উচ্চতা কে শূন্য হিসাব করা হয়। অথচ তার কিন্তু একটা উচ্চতা থেকেই যায়। তাই নিউট্রাল এর নগন্য ভোল্টেজকে শূন্য ধরা হয় যেন ফেইজ – নিউট্রাল actual voltage calculation করা যায়। তাই Theoretically শূণ্য ধরলেও বাস্তবে শূণ্য নয়। ভোল্টেজের চাপই যদি না থাকে কারেন্ট ফিরবে কিভাবে? আর এই কারেন্ট তার সোর্স-এই পুনরায় ফিরে যায়। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে, সমুদ্রের পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায় এবং বৃষ্টি হয়ে পুনরায় সমুদ্রেই ফিরে আসে।

বিদ্যুৎ ; নিউট্রাল কানেকশন
নিউট্রাল কানেকশন

বৈদ্যুতিক ফ্যানের ক্যাপাসিটর লাগানো থাকে চার্জ সঞ্চয় করে রাখার জন্য

এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভূল। ক্যাপাসিটর ব্যবহারের কারণ হল ফেজ টু ফেজ ডিফারেন্স তৈরি করা।

এখন প্রশ্ন আমি কেন ফেজ ডিফারেন্স তৈরি করব?

ফেজ ডিফারেন্স তৈরি না করলে টর্ক সৃষ্টি তথাপি ঘূর্ণন প্রবণতা তৈরি হবেনা। উল্লেখ্য সিংগেল ফেজ মোটরেই ক্যাপাসিটর ব্যবহার করা হয়।কিন্ত থ্রি ফেজ এ ফেজ টু ফেজ ১২০ ডিগ্রি ফেজ ডিফারেন্স থাকে। এজন্য আলাদাভাবে ক্যাপাসিটর ব্যবহার করে ফেজ ডিফারেন্স তৈরি করার দরকার হয়না।

বিদ্যুৎ ; ফ্যান
ফ্যান

পাওয়ার লাইনে সর্বদাই ইন্সুলেশন থাকে

এই ধারণাটিও ভূল। ইন্সুলেশন ছাড়াও কিছু কিছু পাওয়ার লাইন থাকে। তবে নির্জন নিরিবিলি জায়গাতেই সেগুলো স্থাপন করা হয়

বিদ্যুৎ ; পাওয়ার লাইন
পাওয়ার লাইন

লাইভ লাইন ছিড়ে গেলে সেখানে আর বিদ্যুৎ থাকেনা

এই ধারণাটিও সম্পূর্ণ ভূল। লাইভ লাইন ছিড়ে গেলেও সেখানে বিদ্যুৎ প্রবাহ চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার ইন্টারকানেক্টিং সাবস্টেশনের সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করে। তাই কোন পোলের লাইভ লাইন ছিড়ে পড়লে তার থেকে নূন্যতম ১০ ফুট দূরে থাকা উচিত। ঐ পোলের আশেপাশে পানি থাকলেও তা স্পর্শ করা অনুচিত।

বিদ্যুৎ ; ভূমিতে পতিত পাওয়ার লাইন
ভুমিতে পতিত লাইভ লাইন

বৈদ্যুতিক বাতি অন করলে অনবরত জ্বলতেই থাকে

এই ধারণাটি ভূল। বৈদ্যুতিক বাতি কিন্তু শুধুমাত্র এসি প্রবাহের পজিটিভ হাফ সাইকেল পেলেই টার্ন অন হয় আর নেগেটিভ হাফ সাইকেলে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়না।

কেন?

আমরা জানি, আমাদের দর্শনাভূতির স্থায়িত্বকাল 0.1 sec. এখন এই ঘটনাটি ঘটে T = 1/f = 1/50 = 0.02 sec সময়ে। ফলশ্রুতিতে আমরা এই দৃশ্যটি দেখতে পারিনা।

বিদ্যুৎ ; পজিটিভ পিকে অন এবং নেগেটিভ পিকে অফ হওয়া বাতি
পজিটিভ পিকে অন এবং নেগেটিভ পিকে অফ হওয়া বাতি

বিদ্যুৎ নিয়ে অন্যান্য পোস্ট

লোডশেডিং কি ও জনসাধারণের ধারণা এবং কারিগরি বাস্তবতা | বিদ্যুৎ গেলেই কি লোডশেডিং

বিদ্যুৎ নিয়ে কিছু মজার এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা আপনার জেনে রাখা উচিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here