ওভারহেড লাইনের কন্ডাকটরের উপকরণ | Conductor Materials

বিদ্যুৎ শক্তি ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন করার ক্ষেত্রে কন্ডাকটর (conductor) বা পরিবাহী খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। মূলধনের বড় একটি অংশ এই কন্ডাকটর ক্রয়ে ব্যয় করা হয়। তাই কন্ডাকটর বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কন্ডাকটরের সঠিক উপাদান, আকার ও আয়তন নির্বাচন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎ শক্তি ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন করার ক্ষেত্রে যেসব কন্ডাক্টর ব্যবহার করা হয়, তাতে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ থাকা জরুরি:

  • উচ্চ বিদ্যুৎ পরিবাহিতা (High electrical conductivity) সম্পন্ন হতে হবে।
  • উচ্চ টান সহনশীল সম্পন্ন হতে হবে যাতে যান্ত্রিক চাপ সহ্য করতে পারে।
  • দামে সস্তা হতে হবে যাতে বহুদূর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়।
  • কম আপেক্ষিক গুরুত্বসম্পন্ন হতে হবে যাতে প্রতি একক আয়তনে কন্ডাকটরের ওজন কম হয়।

তবে উপরের সকল বৈশিষ্ট্য একটি কন্ডাকটরে পাওয়া যাবে না। তাই কন্ডাকটর নির্বাচনের ক্ষেত্রে কন্ডাকটরের উপাদান, ব্যয় এবং ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য বজায় রেখে কন্ডাকটর বাছাই করতে হবে।

কন্ডাকটর তৈরিতে যেসব ধাতু ব্যবহার করা হয়ঃ

ওভারহেড লাইনের কন্ডাকটর তৈরিতে সাধারণত নিম্নোক্ত ধাতু বা উপকরণ (materials) সমূহ ব্যবহার করা হয়ঃ

  1. Copper (কপার) কন্ডাকটর
  2. Aluminium (অ্যালুমিনিয়াম) কন্ডাকটর
  3. Steel cored aluminium (স্টিল কোর অ্যালুমিনিয়াম) কন্ডাকটর
  4. Galvanised steel (গ্যালভানাইজ স্টিল) কন্ডাকটর
  5. Cadmium copper (ক্যাডমিয়াম কপার) কন্ডাকটর ইত্যাদি

এবার আমরা এসব উপকরণ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো-

কপার (Copper) কন্ডাকটর:

উচ্চ তড়িৎ পরিবাহিতা এবং টান সহনশীল হওয়ার কারণে কপারকে ওভারহেড লাইনের কন্ডাকটরের আদর্শ উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত ওভারহেড লাইনে পরিবাহী হিসেবে hard drawn standard কপার কন্ডাকটর ব্যবহার করা হয়।

কন্ডাকটর
কপার (Copper) কন্ডাকটর

নিচে কপার কন্ডাকটরের কিছু গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো-

  • অন্যান্য কন্ডাকটরের তুলনায় কপার কন্ডাকটরের বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা অনেক বেশি।
  • এই কন্ডাকটর অনেক বেশি টান সহনশীল (tensile strength) হয়ে থাকে।
  • কপার উচ্চ কারেন্ট ঘনত্ব সম্পন্ন (high current density) হওয়ার ফলে পরিবাহীর ক্ষেত্রে কম প্রস্থচ্ছেদ বিশিষ্ট কন্ডাকটরের প্রয়োজন হয়।
  • কন্ডাকটর কম প্রস্থচ্ছেদ বিশিষ্ট বা চিকন হওয়ার ফলে লাইনে বাতাসের চাপ কম পড়ে।
  • এর আপেক্ষিক গুরুত্ব বেশি।
  • এই ধাতু অনেক বেশি সমপ্রকৃতি (Homogeneous) সম্পন্ন হয়ে থাকে।
  • কপার কন্ডাকটরে উচ্চ ভোল্টেজে করোনা জনিত অপচয় কম হয়।
  • গলনাঙ্ক পয়েন্ট বেশি হওয়ায় শর্ট সার্কিট জনিত কারণে এটি সহজে ক্ষয় হয় না।
  • কপারের আয়ুষ্কাল অনেক বেশি (Long life)।
  • কপার পরিত্যক্ত হলেও উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা যায়।

ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশনের জন্য কপার (copper) অবশ্যই আদর্শ কন্ডাকটর, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এর উচ্চ ব্যয় এবং অপর্যাপ্ততার কারণে এটি খুব কম ব্যবহার করা হয়। বর্তমান সময়ে কপার কন্ডাকটরের পরিবর্তে অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটর বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

অ্যালুমিনিয়াম (Aluminum) কন্ডাকটর:

কপারের তুলনায় অ্যালুমিনিয়াম দামে সস্তা এবং ওজনে হালকা। কিন্তু এর conductivity ও tensile strength (টান সহনশীল ক্ষমতা) অনেক কম। পরিবাহী হিসেবে কপারের পরই অ্যালুমিনিয়ামের স্থান হলেও কপার কন্ডাকটরের উচ্চ মূল্যের কারণে ট্রান্সমিশনের ক্ষেত্রে অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটরই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়।

কন্ডাকটর
অ্যালুমিনিয়াম (Aluminum) কন্ডাকটর

নিচে কপার কন্ডাকটর ও অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটরের তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো-

  • অ্যালুমিনিয়ামের বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা কম এবং কপারের তুলনায় এর conductivity শতকরা ৬০ ভাগ।
  • কপার কন্ডাকটরের তুলনায় এর প্রস্থচ্ছেদ বেশি হওয়ার ফলে বাতাসে বেশি দোল (Swing) খায় এবং এর sag (ঝুল) বেশি হয়। এছাড়া একই রেজিস্ট্যান্স সম্পন্ন কপার কন্ডাকটরের তুলনায় অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটরের ব্যাস প্রায় ১.২৬ গুণ বেশি। যার ফলে সাপোর্টিং টাওয়ারগুলো অনেক উঁচু করে নির্মাণ করতে হয়।
  • অ্যালুমিনিয়ামের আপেক্ষিক গুরুত্ব (২.৭১ গ্রাম / সিসি) কপারের আপেক্ষিক গুরুত্বের (৮.৯ গ্রাম / সিসি) চেয়ে কম। তাই ভরের দিক দিয়ে কপার কন্ডাকটরের চেয়ে সমপরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটর প্রায় দেড় ভাগ কম। এজন্য অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটরের জন্য সাপোর্টিং টাওয়ারগুলো কপার কন্ডাকটরের সাপোর্টিং টাওয়ারের মত শক্তিশালী না হলেও চলে।
  • অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটর ওজনে হালকা হওয়ায় বেশি দোল (Swing) খায় তাই এর জন্য বড় ক্রস আর্ম ব্যবহার করতে হয়।
  • অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটরে উচ্চ ভোল্টেজে করোনা জনিত অপচয় কপারের তুলনায় কম। তবে অ্যালুমিনিয়ামের গলনাঙ্ক পয়েন্ট কম বলে শর্ট সার্কিট জনিত কারণে এটি সহজেই ক্ষয় হয়ে যায়।

ধাতুর conductivity, tensile strength, খরচ, ওজন ইত্যাদি দিক বিবেচনা করে কপারের চেয়ে অ্যালুমিনিয়ামই বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটরের sag (স্যাগ) অতিরিক্ত হওয়ার ফলে বর্তমান সময়ে অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে স্টিল সহযোগে স্টিল কোর অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটর হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

স্টিল কোর অ্যালুমিনিয়াম (Steel cored aluminium) কন্ডাকটর:

অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটর কম টান সহনশীল হওয়ায় ট্রান্সমিশনের ক্ষেত্রে তাতে অতিরিক্ত স্যাগ (sag) হয় যার ফলে অল্প অল্প দূরেই পোল বা টাওয়ার বসাতে হয়। যা দূরবর্তী ট্রান্সমিশনের ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল এবং অনুপযুক্ত।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাকটরের সাথে স্টিলের কন্ডাকটর সহযোগে এর টানসহন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়, যা স্টিল কোর অ্যালুমিনিয়াম হিসেবে পরিচিত। যাকে সংক্ষেপে A.C.S.R. (aluminium conductor steel reinforced)ও বলা হয়। এই কন্ডাকটরে স্টিলকে ঘিরে এর চারপাশে অ্যালুমিনিয়ামকে ১:৬ অনুপাতে জড়িয়ে রাখা হয়, এতে যথেষ্ট টান সহনশীল হয়। তবে কন্ডাকটরের টানসহন ক্ষমতা আরও বেশি বৃদ্ধি করার প্রয়োজন হলে এদের প্রস্থচ্ছেদের অনুপাত ১:৪ করা হয়।

কন্ডাকটর
স্টিল কোর অ্যালুমিনিয়াম (Steel cored aluminium) কন্ডাকটর

নিচে এই কন্ডাকটরের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো-

  • এর বিদ্যুৎ পরিবহন ক্ষমতা কপারের চেয়ে কম।
  • এর টান সহনক্ষমতা বেশি।
  • অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিল ব্যবহারের ফলে ওজন কম ও টান সহনক্ষমতা বেশি হওয়ায় তারের স্যাগ কম হয়।
  • তারের স্যাগ কম হওয়ায় এর span length বৃদ্ধি পায় এবং টাওয়ারের উচ্চতা কমে যায়।
  • কপারের তুলনায় এর আপেক্ষিক গুরুত্ব কম।
  • এর দামও তুলনামূলক কম। এবং
  • এর আয়ুষ্কাল (life time) বেশি।

গ্যালভানাইজ স্টিল (Galvanised steel) কান্ডাকটর:

স্টিলের টান সহনশীল (tensile strength) ক্ষমতা যথেষ্ট বেশি বলে ঝড়, বৃষ্টি ও খারাপ আবহাওয়ায়ও এটি টিকে থাকতে পারে। সাধারণত স্বল্প মূল্যের কারণে একে মরিচারোধী করে (Galvanised) পল্লী অঞ্চলে অল্প দৈর্ঘের ট্রান্সমিশন লাইনে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই কন্ডাকটর দীর্ঘ ট্রান্সমিশন লাইনে ব্যবহার করা যায় না।

কন্ডাকটর
গ্যালভানাইজ স্টিল (Galvanised steel) কান্ডাকটর

মূলত নিম্নোক্ত কারণে এই কন্ডাকটর দীর্ঘ ট্রান্সমিশন লাইনে ব্যবহারের অনুপযুক্ত-

  • এর conductivity কপারের তুলনায় অনেক কম।
  • অভ্যন্তরীণ রিয়্যাকট্যান্স অনেক বেশি।
  • উচ্চ রেজিস্ট্যান্স সম্পন্ন।
  • এতে এডি কারেন্ট এবং হিসটেরেসিস লস হয়।
  • এই কন্ডাকটর মরিচা পড়ে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (যদি মরিচারোধী না করা হয়)।

মূলত গ্যালভানাইজ স্টিল কন্ডাকটরকে পল্লী অঞ্চলে স্টে-ওয়্যার, আর্থ ওয়্যার ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।

ক্যাডমিয়াম কপার (Cadmium copper) কান্ডাকটর:

কিছু কিছু ক্ষেত্রে কন্ডাকটরের উপাদানে ক্যাডমিয়ামের সাথে কপার মিশানো হয়। কপারে ১% বা ২% ক্যাডমিয়াম মিশানো হলে এর টান সহনক্ষমতা প্রায় ৫০% বৃদ্ধি পায় এবং তখন এর conductivity বিশুদ্ধ কপারের চেয়ে মাত্র ১৫% কম হয়ে থাকে।

ক্যাডমিয়াম কপার (Cadmium copper) কান্ডাকটর

ক্যাডমিয়াম কপার কন্ডাকটর মূলত অতি দীর্ঘ স্প্যান্সের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে ক্যাডমিয়ামের উচ্চ মূল্যের কারণে এই ধরনের কন্ডাকটরগুলো যেখান থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে শুধুমাত্র সেই সকল এরিয়াতে ব্যবহার করা হয়। অন্য সকল এরিয়াতে এর তেমন একটা ব্যবহার নেই বললেই চলে।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য লেখাসমূহঃ

ওভারহেড লাইনের উপাদানসমূহ সম্বন্ধে পড়ুন।

এসি ট্রান্সমিশনঃ সুবিধা ও অসুবিধা সম্বন্ধে পড়ুন।

ডিসি ট্রান্সমিশনঃ সুবিধা ও অসুবিধা সম্বন্ধে পড়ুন।

ইলেকট্রিক পাওয়ার ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম

বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সম্বন্ধে পড়ুন।

ট্রান্সমিশন-ডিস্ট্রিবিউশন লাইন, ফীডার, গ্রিড সিস্টেম আলোচনা

ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন দুই বন্ধুর পথ যাত্রার এক মজার কাহিনী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here